বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
৩৫০০ পিস ইয়াবাসহ দুই ইয়াবা ব্যাবসায়ীকে আটক করেছে র‍্যাব ১০ অবৈধ বালিয়াড়ি উদ্ধারে অভিযান ঘিরে বিতর্ক। শ্বশুর হত্যায় জামাইয়ের ১৫ লাখ টাকার চুক্তি, ডিবির জালে আরেক আসামি গ্রেফতার। চাঁদপুর পৌর ১১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকৃত জেলেদের মাঝে জেলে কার্ড বিতরণ। মাহে রমজানে কদমতলীতে যানজট নিরসনে উচ্ছেদ অভিযান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা বিএনপি নেতাদের। সুঁই-সুতার ফোড়নে গ্রামীণ নারীর জীবন আজও স্বাচ্ছন্দ কেরানীগঞ্জে ডিবির বিশেষ অভিযানে ২১ লাখ টাকা উদ্ধার, ডাকাত দলের সদস্য গ্রেফতার। কেরানীগঞ্জে কালিন্দী ইউনিয়নের গদাবাগ মৌজায় ৩ শতাংশ ৮৬ অযুতাংশ জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এলাকায়  কেরানীগঞ্জে ৩ নং তারানগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে মামুন উর রহমানকে চান এলাকাবাসী। কেরাণীগঞ্জে মসজিদের ভেতরে খতিবের ওপর হামলার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্বের প্রজন্ম দলের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাবিবুর রহমান হাবিবের ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া অনুষ্ঠিত।

সুঁই-সুতার ফোড়নে গ্রামীণ নারীর জীবন আজও স্বাচ্ছন্দ

সুঁই-সুতার ফোড়নে গ্রামীণ নারীর জীবন আজও স্বাচ্ছন্দ

 

শিবলু – জিসান, নওগাঁ

নওগাঁয় টুপি বুনন শিল্পকে কেন্দ্র করে নারীর কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়ছে। এ শিল্পের প্রায় ৯০ শিল্প কাজই করছেন নারী শ্রমিকেরা। জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার নারী এ পেশায় নিয়োজিত। বিসিকের তথ্য বলছে, রফতানিযোগ্য টুপি বুনন শিল্পে নওগাঁয় প্রায় অর্ধ লাখ নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এ শিল্প থেকে প্রতি বছর অন্তত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। অবসর সময়ে টুপি তৈরি করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে এ শিল্পে নিয়োজিত নারীদের। তাদের তৈরি এসব টুপি রপ্তানি হচ্ছে ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।

 

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চান্দাশ, মহাদেবপুর সদর, উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামসহ জেলার মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার নারী টুপিতে নকশা তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের নকশা করা টুপি যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। দেশে আসছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

 

সম্ভাবনাময় এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি নারী কারিগরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, নির্দিষ্ট নকশার ওপর নওগাঁর নারীরা নানা রঙের সুতায় যে টুপি বুনে চলেছেন, তা ওমানের জাতীয় টুপি হিসেবে স্বীকৃত। এই টুপি দেশটিতে ‘কুপিয়া’ নামে পরিচিত। সাধারণত ‘কেন্দুয়া’র (এক ধরণের পাঞ্জাবি) সঙ্গে বিশেষ ধরণের এই টুপি পরেন সেখানকার পুরুষেরা। নওগাঁর নারীদের হাতে তৈরি এসব টুপির প্রধান বাজার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান। ওমান ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার এবং আফ্রিকা মহাদেশের দেশ তানজানিয়া ও মরক্কোর বাজারেও রপ্তানি হয় এসব টুপি। নওগাঁ থেকেই এ বছর প্রায় ৮০০ কোটি টাকার টুপি রপ্তানি হবে বলে প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

বছরের দুই ঈদে এই টুপির চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। সারা বছর টুপি সেলাইয়ের টুকটাক কাজ হলেও রমজান এবং দুই ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়ে যায় স্থানীয় কারিগর ও ব্যবসায়ীদের। সুঁই-সুতা দিয়ে তৈরি চমৎকার এসব টুপির চাহিদাও ব্যাপক। এই টুপির কারিগর মূলত গ্রামীণ নারীরা। টুপি সেলাইয়ের কাজ করে এখন অনেকের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। সংসারের কাজের পাশাপাশি টুপি সেলাইয়ের কাজকেই তাঁরা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

 

টুপি কারিগর, ব্যবসায়ী ও মহাদেবপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক যুগ আগে ফেনী জেলা থেকে তায়েজ উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী মহাদেবপুর উপজেলার সদরের কুঞ্জবন গ্রামের নারীদের টুপিতে নকশা তৈরির কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

 

শুরুতে গুটিকয়েক নারী আগ্রহী হলে তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নকশা তৈরির কাজ শুরু হয়। সংসারের কাজের ফাকে নকশা তৈরির কাজ করে ওই সব নারীর বাড়তি আয় করতে দেখে কুঞ্জবন গ্রাম ও আশপাশের অন্য নারীরাও নকশা তৈরির কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় মহাদেবপুর উপজেলার সদর, খাজুর, উত্তরগ্রাম, চান্দাশ, হাতুড় ও রাইগাঁ ইউনিয়ন, মান্দা উপজেলার ভালাইন, গনেশপুর, মান্দা সদর ও পরানপুর ইউনিয়ন, নিয়ামতপুর উপজেলার সদর, চন্দননগর, হাজীনগর ও ভাবিচা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে টুপিতে নকশা তৈরির কাজ ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে টুপি তৈরির কাজের সঙ্গে প্রায় ১৫০ জন ব্যবসায়ী জড়িত। আর টুপি তৈরির কাজে প্রায় ৫০ হাজার নারী কারিগর জড়িত।

 

ব্যবসায়ী ও কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক থান কাপড় থেকে প্রকারভেদে ৯০ থেকে ১০০টি টুপি তৈরি হয়। এরপর সাইজ করা টুপির কাপড়ে নকশা করা ট্রেসিং পেপার রেখে তেল ও ব্লু (নীল রং) রং দিয়ে ছাপ (নকশা) দেওয়া হয়। এরপর ছাপ দেওয়া টুপির কাপড়গুলো নকশা করার জন্য মাঠ কর্মীরা (এজেন্ট) বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারী কারিগরদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। নারী কারিগরেরা কাপড়ের ছাপের ওপর সুঁইয়ের সাহায্যে বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে নান্দনিক নকশা ফুটে তোলেন। টুপির কাপড়ে নকশা তোলার কাজ শেষ হলে কারিগরদের মজুরি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টুপিগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। এরপর নকশা করা টুপির কাপড়গুলো চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

 

বিশেষ ধরনের এ টুপিতে মূলত চেইন, দেওয়ান, বোতাম, গুটি দানা ও মাছের কাঁটা সেলাই নামের ছয় ধরণের নকশা হয়ে থাকে। প্রতিটি টুপিতে থাকে আলাদা আলাদা নকশা। কারিগরদের পারিশ্রমিকের তারতম্য হয় কাজের মান ও গুণের ওপর। কারিগররা টুপিতে সুঁই-সুতার ফোঁড়নে নকশা করে প্রতিটি টুপিতে মজুরি পান ১৬ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ১৬ টাকা মজুরির একটি টুপির কাপড়ে নকশা তুলতে একজন কারিগরের দেড় থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগে। সংসারের ফাঁকে ফাঁকে একজন কারিগর দিনে পাঁচ থেকে ছয়টি টুপির কাজ করতে পারেন। সবচেয়ে বেশি সময় ও পরিশ্রম হয় দানা সেলাইয়ে। দানা সেলাইয়ে একেকটি কুপিয়া টুপির নকশা করতে একজন ।

 

কারিগরের ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। দানা সেলাইয়ের নকশা করে একজন কারিগর প্রতিটি টুপিতে মজুরি পান ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে দানা সেলাইয়ে হাতের কাজ অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে করতে হয় বলে একজন কারিগরের পক্ষে মাসে দুই বা তিনটির বেশি টুপিতে নকশা করা সম্ভব হয় না।

 

সম্প্রতি মহাদেবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের খোসালপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় একটি বাড়ির উঠানে বসে অন্য নারীদের সঙ্গে টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন গৃহবধূ আশা বেগম (৪০)। তিনি বলেন, তাঁর বাবার বাড়ি উপজেলার বাগডোব গ্রামে। বাবার বাড়ি হাতের ও মেশিনে সেলাইয়ের কাজ শিখেছেন। ১০ বছর আগে খোসালপুর গ্রামে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই তিনি দেখছেন বাড়ির অন্য নারী সদস্য ও প্রতিবেশি নারীরা টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন। টুপি সেলাই করে বাড়তি আয়ের আশায় তিনিও এ কাজে জড়িয়ে পড়েন। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুপিতে নকশা তোলার কাজ সপ্তাহে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন তিনি। বর্তমানে খোসালপুর গ্রামে তাঁর মতো আরও ৮০ থেকে ৯০ জন নারী টুপিতে নকশা তোলার কাজের সঙ্গে জড়িত।

 

কুঞ্জবন ঈদগাহপাড়া গ্রামের গৃহবধূ জুলেখা বেগম বলেন, টুপির প্রাথমিক কাজ ছাপার (প্রিন্টিং নকশা) ওপর হাতে সেলাই করে নকশা তোলা হয়। কাজের গুন ও মানভেদে প্রতিটি টুপিতে নকশা তোলার কাজ করে ১৬ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান তিনি। তবে টুপিতে নকশা তোলার কাজে যে পরিমাণ পরিশ্রম তার তুলনায় তাঁরা মজুরি পান খুবই কম। সারা দিনে পাঁচ-ছয় ঘন্টা পরিশ্রম করে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা মজুরি পান তাঁরা। মজুরি আরেকটু বেশি হলে আরও বেশি আয় হতো তাঁদের।

 

মহাদেবপুর উপজেলার টুপির বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন মধুপুর গ্রামের সুজন হোসেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িত। সুজন হোসেন বলেন, কুপিয়া টুপির ব্যবসা দিন দিন প্রসার হচ্ছে। আগে ফেনী ও নোয়াখালি জেলা থেকে টুপির কাপড়, সুতা ও নকশা করে নিয়ে আসতে হতো। ব্যাপক চাহিদা থাকা এখন স্থানীয় পর্যায়ে টুপির সব উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। আমার অধীনে বর্তমানে ২০ জন এজেন্ট কাজ করে। একেকজন এজেন্টের অধীনে ৫০০ থেকে ১ হাজার জন নারী কারিগর টুপি সেলাইয়ের কাজ করেন। গিট, দেওয়ান, চেইন ও মাছের কাঁটা নকশা টুপি সেলাইয়ে সময় কম ও মজুরিও কম।

 

তিনি বলেন, বিশেষ ধরনের এসব টুপি দেশের বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে এর চাহিদা বেশি। তাঁদের রপ্তানি করা টুপিগুলো প্রকারভেদে প্রতিটি টুপি ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়ে থাকে। ছোট-বড় মিলিয়ে নওগাঁতে প্রায় ১৫০ জন টুপি ব্যবসায়ী আছে। এ বছর নওগাঁ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার টুপি রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।

 

মহাদেবপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান জানান, ‘মহাদেবপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের নারীরা টুপি সেলাই করে স্বাবলম্বী হওয়ারর প্রচেষ্টার তুলনা হয় না। টুপিতে নকশার কাজ করে বাড়তি আয় করছেন গ্রামীণ নারীরা, এটা সত্যই একটা দৃষ্টান্ত। তবে টুপির নকশা করার কাজ করা নারীরা মজুর বৈষম্যের শিকার হচ্ছে কিনা, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। বৈষম্যের শিকার হলে উভয়পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে নায্য মজুরি নির্ধারণের ব্যাপারে আমি মধ্যস্ততা করার চেষ্টা করব।’

#

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত © সংবাদ সবসময় - ২০২৩
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়ঃ Marshal Host